
সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাচন কার্যালয় যেন অনিয়ম ও ঘুষ বাণিজ্যের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। নতুন ভোটার তালিকায় নাম তোলা, তথ্য সংশোধন কিংবা ফিঙ্গারপ্রিন্ট প্রদানের ক্ষেত্রে অনাবাসী ও প্রবাসী বাংলাদেশিরা পদে পদে চরম ভোগান্তি ও অর্থ দাবির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। কোনো কাজই নির্ধারিত নিয়মে সহজভাবে হচ্ছে না; প্রতিটি ধাপে দালালদের মোটা অঙ্কের টাকা না দিলে আটকে যাচ্ছে প্রবাসীদের প্রয়োজনীয় নথিপত্র।
স্থানীয় ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বিদেশফেরত প্রবাসী কিংবা প্রবাসে অবস্থানরতদের প্রসেসিং সংক্রান্ত কাজ করতে আসলেই একশ্রেণির দালাল চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। একজন প্রবাসীকে ভোটার তালিকাভুক্ত করা কিংবা ফিঙ্গারপ্রিন্ট প্রদানের সুযোগ করে দিতে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত দাবি করা হচ্ছে। টাকা না দিলে নানাবিধ অজুহাতে দিন পার করলেও মিলছে না প্রয়োজনীয় সেবা।
সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো, জীবিকার তাগিদে মধ্যপ্রাচ্য বা সৌদি আরবগামী নারী শ্রমিকরাও এই সিন্ডিকেটের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছেন না। বিদেশে যাওয়ার পূর্বশর্ত হিসেবে দ্রুততম সময়ে ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা ভোটার সংক্রান্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে গিয়ে নারী প্রবাসীদেরও বাধ্য হয়ে হাজার হাজার টাকা তুলে দিতে হচ্ছে দালাল চক্রের হাতে। সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী প্রতি মঙ্গলবার ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা ভোট তোলার কথা থাকলেও, টাকা দিলে যেকোনো দিন সাথে সাথেই তা নেওয়া হয়; আর টাকা না দিলে পার হয়ে যায় সপ্তাহের পর সপ্তাহ।
ভুক্তভোগী এক প্রবাসীর স্বজন জানানপ্রবাসী স্বজনের ভোটার সংক্রান্ত কাজ করতে এসে দেখেছি সোজা পথে কোনো কাজ হয় না। বাইরে ঘুরতে থাকা দালালদের টাকা দিলে ভেতরে দ্রুত কাজ হয়ে যায়, আর না দিলে কাগজপত্রে ভুল ধরে হয়রানি করা হয়। অফিস কর্মকর্তা ও বাইরের দালাল চক্রের গভীর যোগাযোগের কারণেই এই অনিয়ম দিনে দিনে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। কর্মচারীদের সাথে বাইরের দালালদের নিয়মিত ফোনে যোগাযোগ চলে। দালালরা ফাইল আগেই ভেতরের লোকজনের কাছে জমা দিয়ে আসে, পরে ফোনে ফোনে লেনদেন ও কাজের সিদ্ধান্ত হয়।"
অভিযোগ রয়েছে, নির্বাচন অফিসের ভেতরকার কিছু অসাধু কর্মচারী ও বাইরের চিহ্নিত দালাল সিন্ডিকেটের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী ‘কমিশন নেটওয়ার্ক’ গড়ে উঠেছে। অফিসের নির্দিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তির অঘোষিত ইশারাতেই দালালরা সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে বেপরোয়া টাকা আদায় করছে। চিহ্নিত এই দালালদের প্রতিনিয়ত জগন্নাথপুর সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়, ভূমি অফিস ও নির্বাচন অফিস প্রাঙ্গণে ঘোরাঘুরি করতে দেখা যায়।
প্রবাসীদের অভিযোগ, প্রবাসে কষ্টে অর্জিত অর্থ পাঠিয়া দেশের অর্থনীতি সচল রাখলেও নিজ জন্মভূমিতে সরকারি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে তাদের এভাবে জিম্মি হতে হচ্ছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। প্রবাসীরা যখন ভোটার হতে অফিসে আসেন, তখন নির্বাচন কর্মকর্তা তাদের একটু ভালোভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই এসব দালালদের নাম ও পরিচয় বেরিয়ে আসবে বলে মনে করেন সচেতন মহল।
এই চরম ভোগান্তি থেকে মুক্তি পেতে এবং জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাচন অফিসের দালাল সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আশু হস্তক্ষেপ, তালিকা প্রস্তুত করে দালালদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী প্রবাসী ও স্থানীয়রা।
এ ব্যাপারে জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবুল খায়ের অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, "আমার অফিসে ভোট তুলতে কোনো টাকা লাগে না। কাগজপত্র সঠিক থাকলে সাথে সাথেই সেবা দেওয়া হয়। আমাদের এখানে কোনো দালাল আসে না।"